
ছবি: প্রতিনিধি
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই জটিল হয়ে উঠছে রাজনৈতিক দলগুলোর জয়-পরাজয়ের সমীকরণ। শহর থেকে গ্রাম সর্বত্রই এখন বইছে নির্বাচনি হাওয়া। তবে কিশোরগঞ্জের দুটি আসনে মূল লড়াইয়ের সমীকরণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে অভ্যন্তরীণ কোন্দল।
জেলার দুটি আসনেই দলের শক্তিশালী নেতা ‘বিদ্রোহী’ বা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে থাকায় অনেকটাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন বিএনপির মনোনীত প্রার্থীরা। দল থেকে বিদ্রোহীদের বহিষ্কার করা হলেও ভোটের মাঠে তাদের প্রভাব নিয়ে চরম শঙ্কায় রয়েছেন স্থানীয় নেতা-কর্মীরা।
বিএনপির এই ঘরোয়া বিবাদের সুযোগে নির্বাচনি মাঠে বাড়তি সুবিধা পাচ্ছেন ১১ দলীয় নির্বাচনি ঐক্য জোট ও ইসলামী সমমনা দলগুলোর প্রার্থীরা।প্রচার-প্রচারণায় তাদের বেশ ফুরফুরে মেজাজে দেখা যাচ্ছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে কিশোরগঞ্জ-১ (সদর ও হোসেনপুর) ও কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনে জমে উঠেছে নির্বাচনি প্রচার প্রচারণা। নির্বাচনের দিন যতই ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে ভোটের উত্তাপ। কাকডাকা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত নেতাকর্মী ও সমর্থকদের সাথে নিয়ে মাঠ চষে বেড়াচ্ছেন প্রার্থীরা। তবে এ দুই আসনে বিদ্রোহীর আগুনে পুড়ছে দুই ধানের শীষ প্রার্থী মো. মাজহারুল ইসলাম ও সৈয়দ এহসানুল হুদা। প্রার্থীরা নির্বাচনি সভা, উঠান বৈঠক, গণসংযোগ ও পথসভার মাধ্যমে কর্মী-সমর্থকদের ভোট প্রার্থনা চলছে অবিরাম। নানা কৌশল ও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করা হচ্ছে।
কিশোরগঞ্জ-১ আসনটি বর্তমানে জেলার সবচেয়ে আলোচিত ও জটিল আসন। এখানে বিএনপির অভ্যন্তরীণ বিরোধ চরম রূপ নিয়েছে। এ আসনে আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
তারা হলেন, কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির তিনবারের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক বিএনপি প্রার্থী মো. মাজহারুল ইসলাম (ধানের শীষ) ও বিএনপির বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থী ২০১৮ সালে দলীয় মনোনয়ন প্রাপ্ত জেলা বিএনপির সাবেক সহসভাপতি ও সাবেক বিভাগীয় স্পেশাল জজ, বীর মুক্তিযোদ্ধা রেজাউল করিম খান চুন্নু (মোরগ)। দলীয় বিভক্তিকরণে ভোট ভাগ হলেও সমীকরণে এগিয়েছে বিএনপির প্রার্থী।
দুই খেলাফতের ঠেলাঠেলি
সকালে একজন নিজেকে জোটের প্রার্থী দাবি করছেন তো বিকালে আরেকজন দাবি করছেন প্রার্থী৷ ফলে এই আসনে জোট প্রার্থী নিয়ে হযবরল অবস্থা তৈরি হয়েছে। নিজেদের জোট প্রার্থী দাবি করে মাঠে রয়েছেন, খেলাফত মজলিসের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির আহমদ আলী কাসেমী (দেওয়াল ঘড়ি) বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ( মামুনুল হক) হেদায়াতুল্লাহ হাদী (রিকশা)। শেষ পর্যন্ত এই আসন উন্মুক্ত থাকতে পারে বলে জোটের একটি সূত্র জানিয়েছে।
অন্যরা হলেন সিপিবি প্রার্থী মো. এনামুল হক (কাস্তে), বাসদ প্রার্থী মো. মাসুদ মিয়া (মই), বাসদ (মার্কসবাদী) প্রার্থী আলাল মিয়া (কাঁচি), ন্যাশনাল পিপলস পার্টি প্রার্থী তারেক মোহাম্মদ শহীদুল ইসলাম (আম)। তবে বিএনপি, স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় ধানের শীষের প্রার্থীর কপাল পুড়ছে, এতে তাদের মধ্যেই ভোটযুদ্ধ হবে বলে মনে করছেন অনেকেই। ধানের শীষের প্রার্থী মো. মাজহারুল ইসলাম জেলা বিএনপির তিনবারের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক হওয়ায় দলীয়ভাবে তার অবস্থান সৃষ্টি হয়েছে। দলীয় সাংগঠনিক কাঠামো ও দুই উপজেলার নেতাকর্মীদের বড় অংশ তার পক্ষে মাঠে রয়েছেন। প্রতিদিন নির্বাচনি জনসভা ও গণসংযোগ ছাড়াও যোগ দিচ্ছেন নানা অনুষ্ঠানে, দিচ্ছেন প্রতিশ্রুতি।
এলাকার নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ৩ ডিসেম্বর মনোনয়ন ঘোষণার পর থেকেই কিশোরগঞ্জ-১ আসনের বিএনপি নেতাকর্মীদের একটা বড় অংশ মো. মাজহারুল ইসলামের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন। মনোনয়নপত্র দাখিলের আগ পর্যন্ত নেতাকর্মীর একটা বড় অংশই তার মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ, মানববন্ধন-এমন কী মহাসড়ক পর্যন্ত অবরোধ করেছেন। তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপি মো. মাজহারুল ইসলামেই চূড়ান্ত প্রার্থী হিসাবে মনোনয়ন দেওয়া হয়। এ আসনে বিএনপির আরও চারজন মনোনয়নপ্রত্যাশী থাকলেও তারা মাঠ থেকে সরে গেছেন। তবে রেজাউল করিম খান চুন্নু মাঠ ছাড়তে রাজি হননি। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ইতিমধ্যে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
কিশোরগঞ্জ-৫ (নিকলী-বাজিতপুর) আসনে বিএনপির প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদা। প্রথমে শেখ মুজিবুর রহমানকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা হলেও বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। পিতার দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগদান করা এহসানুল পান চুড়ান্ত মনোনয়ন। তবে দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ভোটের মাঠে লড়ছেন শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে ইতিমধ্যে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। এ আসনে মূল লড়াই হবে বিএনপির প্রার্থী ও বিদ্রোহী স্বতন্ত্র প্রার্থীর মধ্যে।
কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তারা হলেন, বিএনপি প্রার্থী সৈয়দ এহসানুল হুদা (ধানের শীষ), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী মো. রমজান আলী (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ প্রার্থী মোহাম্মদ দেলাওয়ার হোসাইন (হাতপাখা), জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. মাহবুবুল আলম (লাঙ্গল), বাংলাদেশ মুসলিম লীগ প্রার্থী মো. সাজ্জাদ হোসেন (হারিকেন), বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্ট প্রার্থী মো. অলি উল্লাহ (মোমবাতি) এবং দুই স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল (হাঁস) ও হাসনাত কাইয়ূম (হরিণ)। তবে এ আসনে বিএনপির ভোট কার্যত তিন ভাগে ভাগ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। এই সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগাচ্ছেন জামায়াতের প্রার্থী প্রার্থী মো. রমজান আলী। তিনি নীরবে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় বৈঠক করে নিজের অবস্থান মজবুত করেছেন।
জানা যায়, কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনে ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছিলেন বিএনপির সাবেক কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য এবং সাবেক বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল। নেতাকর্মীদের আন্দোলনের মুখে মনোনয়ন পরিবর্তন করে প্রয়াত বিএনপি নেতা মজুবুর রহমান মঞ্জুকে মনোনয়ন দেওয়া হয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনেও দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হন ইকবাল। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপির মনোনয়ন পান ইকবাল। এবারের নির্বাচনেও ইকবালকে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়ন দেওয়া হয়। চূড়ান্ত পর্যায়ে ১২ দলীয় জোটের সমন্বয়ক সৈয়দ এহসানুল হুদা বিএনপির মনোনয়ন পান। এতে নেতাকর্মী ও সমর্থকদের নিয়ে ইকবাল রাজপথ-রেলপথ-নৌপথ অবরোধের মতো কর্মসূচি করেন। কোনো সাড়া না পেয়ে অবশেষে তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
এমন পরিস্থিতিতে বিএনপি থেকে ২১ জানুয়ারি তাকে বহিষ্কার করা হয়। পরে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র (বিদ্রোহী) প্রার্থী শেখ মুজিবুর রহমান ইকবালের পক্ষে নির্বাচনি কর্মকাণ্ড পরিচালনার অভিযোগে ২৬ জানুয়ারি বাজিতপুর ও নিকলী উপজেলার ১৭ জন নেতাকর্মীকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। সর্বশেষ ১ ফেব্রুয়ারি বাজিতপুর ও নিকলী উপজেলা বিএনপির ১৪ নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
কিন্তু ভোটের মাঠে বিদ্রোহীদের অবস্থান বিএনপি প্রার্থীদের অনেকটা চাপে ফেলতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। একই সঙ্গে দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বিরোধ প্রকাশ্য রূপ নিচ্ছে।
বিএনপির তৃণমূলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সাথে কথা বলে জানা যায়, ‘দলীয় মনোনয়ন নিয়ে বিএনপির মধ্যে এত কোন্দল ও দ্বন্দ্ব তৈরি হবে, তা ভাবিনি। দল যাকে মনোনয়ন দিয়েছে, আমরা তার পক্ষেই কাজ করছি। কিন্তু একটি পক্ষ দলীয় সিদ্ধান্ত মানতে নারাজ। ফলে তারাও বহিষ্কার হয়েছেন। দলের বাহিরে যাওয়া একজন নেতার ঠিক নয়।

